প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরের গুরুত্ব | মতামত নিউজ

প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরের গুরুত্ব

বিশ্বে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সময়ের সঙ্গে এবং বিশেষ কিছু কারণে সৃষ্টি হয়। তাদের সাধারণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং প্রজ্ঞা ওই বিশেষ কারণে অসাধারণ হয়ে ওঠে। তারা সময়ের সৃষ্টি করা নেতা। কিন্তু ড. ইউনূসের মতো সামাজিক নেতা বিশ্বে বিরল। তাই বলে তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কম বা নেই বললে ভুল হবে।

মূল চারটি কারণে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিশ্বের উদিয়মান শক্তি চীন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করবে। ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্ত বিরোধসহ বাংলাদেশের ওপর ভারতের আধিপত্য হ্রাস করা তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম একটি কৌশল, যা এই সফরের মাধ্যমে অনেকটাই অর্জিত হওয়ার আশা চীনের। তৃতীয়ত ড. ইউনূসের মতো একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করা এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বাজার ধরে রাখা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম যে, একটি শক্তিশালী ও বৃহৎ দেশ এদেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে বিশেষ বিমান পাঠিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং তাকে অভূতপূর্ব সম্মান দেখিয়েছেন তারই মধ্যে নিহিত রয়েছে এই সফরের গুরুত্ব।

বিশ্বে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সময়ের সঙ্গে এবং বিশেষ কিছু কারণে সৃষ্টি হয়। তাদের সাধারণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং প্রজ্ঞা ওই বিশেষ কারণে অসাধারণ হয়ে ওঠে। তারা সময়ের সৃষ্টি করা নেতা। কিন্তু ড. ইউনূসের মতো সামাজিক নেতা বিশ্বে বিরল। তাই বলে তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কম বা নেই বললে ভুল হবে। ড. ইউনূস শুধু নোবেল বিজয়ীই নন, পৃথিবীতে শান্তি ও অর্থনীতিতে অনেক নোবেল বিজয়ী আছেন কিন্তু ড. ইউনূস তার তত্ত্ব প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন অর্থাৎ প্রাকটিক্যালি দেখিয়েছেন তার ‘সোশ্যাল বিজনেস’-এর  বিষয়টি। এ জন্যই গোটা পৃথিবী তাকে সম্মান করে। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ বহু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাকে  ‘হুজুর’ মানেন।

আমরা জানি, বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া একটি অলাভজনক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। এটি এশিয়ার ২৫টি রাষ্ট্রসহ ২৮টি রাষ্ট্র নিয়ে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে গঠিত হয়। এই ফোরামের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একত্রীকরণকে উৎসাহ জোগানো এবং এশীয় দেশগুলোকে তাদের উন্নয়ন লক্ষ্যের আরো কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। প্রতিবছর মার্চের শেষ সপ্তাহে বোয়াও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। চীনের দক্ষিণের শহর হাইনানেই এ সম্মেলনের স্থায়ী ভেন্যু। বোয়াও ফোরামের অন্তর্ভুক্ত সব সদস্যরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান অথবা সরকারপ্রধান নিয়ে এ সম্মেলনটি আয়োজন করা হয়। এটি প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিলেন ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ভি রামোস, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বব হাউকে এবং জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরিহিরো হোসকার মতো প্রভাবশালী নেতারা। এবার সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘পরিবর্তনশীল বিশ্বে এশিয়ার ভবিষ্যৎ গঠন’। ২০২২ খিষ্টাব্দে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ সম্মেলন থেকেই বৈশ্বিক নিরাপত্তার উদ্যোগ (গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ) ঘোষণা করেছিলেন। এই সম্মেলনে ড. মুহাম্মদ ইউনুস তার মূল্যাবন ভাষণ দেন।

১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে চীন। এ বছর এই সম্পর্ক ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এটি একটি মাইফলক বলেছেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী। শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অর্থনৈতিক এবং কারিগরি সহযোগিতা-সংক্রান্ত একটি চুক্তি ও ক্ল্যাসিক সাহিত্যের অনুবাদ ও প্রকশনা, সাংষ্কৃতিক ঐতিহ্য বিনিময় ও সহযোগিতা, সংবাদ বিনিময়, গণমাধ্যম, ক্রীড়া ও স্বাস্থ্য খাতে আটটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছেন। বিনিয়োগ-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর ঘোষণা, চীন শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চল শুরুর ঘোষণা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের জন্য একটি বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর, রোবট ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ এবং হৃদরোগ সার্জারি যানবাহন দানের বিষয়ে পাঁচটি ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আর ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্লোবার ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ প্রচারের ওপর জোর দিচ্ছে, যা একটি বিকল্প উন্নয়ন মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে এই উদ্যোগে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিয়ে কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। কাজেই, আলোচনা হলেও অগ্রগতি কতোটা হবে সেটি সময় বলে দেবে। বাংলাদেশ ও চীন উভয়ই রোহিঙ্গা সমাধান হিসেবে প্রত্যাবসনকে সমর্থন করে, তবে কার্যকর অগ্রগতি এখানে আশানুরূপ হয়নি। এই সফরে মানবিক তহবিল বাড়ানো ও মিয়ানমার সংশিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা প্রসঙ্গে চীনের আরো সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। চীন ও বাংলাদেশ উভয়েই মায়ানমারে বোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনকে একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে দেখলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনো অধরাই রয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমাধান আশা করা বাস্তবসম্মত নয় তবে মানবিক তহবিল সংকট মোকাবিলায় চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এই সময়ে চীনের সঙ্গে যেটি হতে যাচ্ছে সেটি হলো চীনের দক্ষিন-পশ্চিমের শহর কুনমিং হতে পারে বাংলাদেশি রোগীদের বিকলপ চিকিৎসার ঠিকানা যেহেতু ভারত সরকার ভিসা বন্ধ রেখেছে। ঢাকা থেকে কুনমিং দুই ঘণ্টার যাত্রা। ইতোমধ্যে কুনমিংয়ের চারটি হাসাপাতাল বাংলাদেশীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, বাংলাদেশের একদল প্রতিনিধি ইতোমধ্যে হাসপাতাল চারটি দেখে এসেছেন। এখন ভাড়া ও সহজ ভিসা নিয়ে কথা বলার পালা। এ ছাড়াও বাংলাদেশে একটি বৃহৎ হাসপাতাল করার কথা চলছে। যেহেতু উভয় দেশ জলবায়ু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, টেকসই উন্নয়ন ও সবুজ প্রযুক্তি বিষয়ে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ন এজেন্ডা হতে পারে। সবুজ শক্তি ও দুর্যোগ স্থিতিস্থাপকতার সম্পর্কে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ অন্বেষণ করা যেতে পারে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) উদ্যোগের আওতায় চীন বাংলাদেশকে মোট ৪০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে ২৬ বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য এবং ১৪ বিলিয়ন ডলার যৌথ বিনিয়েগ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ থাকবে। এ পর্যন্ত চীন ৩৫টি প্রকল্পের জন্য ৪ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলা ঋণ অনুমোদন করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি বিআরআইয়ের আওতায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য পূর্ববতী সরকার এক বৃহৎ ঋণ নিয়েছে। সেই ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক তবে চীন সুদের হার ২-৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করতে রাজী করানোর আলোচনা হওয়ার কথা। সেটি আমরা সেভাবে দেখতে পাইনি, তবে আলোচনা নিশ্চয়ই হয়েছে কিংবা বিষয়টি এগিয়ে রয়েছে এই সফরের মাধ্যমে।

গোটা পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ মানুষের বসবাস দক্ষিণ এশিয়ায়। চীনা পণ্যের অনেক বড় বাজার এখানে। যেকোনো মূল্যে চীন চাইবে দক্ষিণ এশিয়ায় তার পণ্যের বাজার ধরে রাখতে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এটি আরো বাড়াতে চাবে চীন। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা--সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বৃত্তি ও অ্যাকাডেমকি সহযোগিতার মাধ্যমে মানুষে মানুষে সম্পর্ক জোরদারকরণ সদিচ্ছা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়িয়ে তোলার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বৃত্তি ও একাডেমিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে শিক্ষাগত সহযোগিতা জোরদার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেয়ার বিষয়টি এ সফরে গুরুত্ব পাওয়ার কথা। অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর এমন একটি সময়ে হচ্ছে যখন উভয় দেশ জটিল ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চাশা থাকলেও এই সফরের মূল্যায়ন করতে হবে একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে। সবশেষে বলা যায, কোনো চুক্তি স্বাক্ষর না হলেও প্রধান উপদেষ্টার এই সফর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পরবর্তী সরকারের জন্য এটি একটি বিরাট অগ্রগতি হয়ে থাকলো। বাংলাদেশ তিস্তা নদীতে বাঁধের কারণে যে সমস্যার সম্মুখীন চীনের সেখানে বিরাট ভূমিকা রাখবে। প্রধান উপদেষ্টা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে ৫০ বছরের একটি প্ল্যান চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রীর কাছে আহ্বান করেছেন। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ক্ষেত্রেই বহুদূর এগিয়ে থাকলো। দীর্ঘজীবী হোক চীন-বাংলাদেশ মৈত্রি ও সহযোগিতা।

লেখক: ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষক