সরকার ও সংশ্লিষ্ট ছাড়া কেউ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। সন্তুষ্ট থাকার সংগত কোনো কারণও নেই। ঢাকার অলিগলি এখন সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো রোমহষর্ক ঘটনা। তার ওপর আবার যাত্রীবাহী বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের মতো ঘটনা জনমনে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট করেছে।
এসব ঘটনাপ্রবাহ পাশ কাটিয়ে চলতে হচ্ছে মানুষজনকে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে দেশে কি আদৌ কোনো সরকার আছে? যদি থেকে থাকে তবে তার কাজই বা কী? আমাদের দেশের কতিপয় সুশীল বুদ্ধিজীবী সবসময় চিবিয়ে কথা বললেও এখনকার সময়ে বেশ সাবলীল হয়ে বলছেন, বিপ্লবোত্তর যেকোনো দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা! তাহলে সেইসব বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন রাখতে চাই, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি তথা স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে কি জনগণকেই আবার মাঠে নামতে হবে? আমার মনে হয় এবার বোধ করি এই ত্রাসের একচেটিয়া রাজত্বের এখনই লাগাম টানতে হবে।
না হলে মানুষের মনে যে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে তার বহিঃপ্রকাশ আরো চরমভাবে ঘটতে পারে। কারণ, যেকোনো কারণ ছাড়াই আক্রান্ত হবে, সেও নিশ্চয়ই তার নিজের নিরাপত্তার জন্য কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দিকে চেতে থাকার সংগত কোনো কারণও দেখছি না।
আমি জানি না কীভাবে সরকার এতোটা চুপ বা নির্বিকার থাকতে পারে! যদিও সরকার থেকে বলা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে! এই কথা কোনো সুস্থ বোধ সম্পন্ন মানুষ বিশ্বাস করার যৌক্তিক কোনো কারণও দেখছি না। সারাদেশে চলমান অপারেশন ডেভিল হান্ট কার্যক্রমের মধ্যেই লাগাতার অপরাধ পরিক্রমা সাধারণ নাগরিকদের কতোটা অসহায় করে তুলেছে সেটা বলে কয়ে দিতে হয় না। রাস্তায় চলাচলরত মানুষের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট! আর সরকার দায়সারা বিবৃতি দিয়ে! এভাবে আর কতো? আর কতো প্রাণ ঝরলে বোধদয় হবে আমাদের? আমরা কি মানুষ আছি, নাকি অন্য কোনো প্রাণী ভর করেছে আমাদের দেহে?
‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামক সন্ত্রাস দমনেচ্ছু যৌথ বাহিনীর এই কাজও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। কারণ, ঢাকায় রাতে ‘ক্রসফায়ার’ নামক সেই পুরনো কাসুন্দি নির্ভর নরহত্যার বানোয়াট ও ভিত্তিহীন গল্প আর মানুষ গিলছে না। তবে অতীতেও যতো অপারেশন পরিচালিত হয়েছিলো তাতেও বিনাবিচারে মানুষ হত্যার অভিযোগ উঠলেও অপারেশন ক্লিন হার্ট চলাকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা কথিত অপরাধী ধরার পর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ধামাচাপা দিতে বহু গল্প পাতা হয়।
শেষমেশ মানুষ বিশ্বাস করেনি। আর সেইসব অপরাধ মনে করে তারা আইন করে দায়মুক্তি চেয়েছিলো ও পেয়েছিলো। এবার অপারেশন ডেভিল হান্টে ততোটা নির্যাতন ও মৃত্যুর খবর শোনা না গেলেও অপরাধ জগতের তথাকথিত রাঘববোয়ালদের থাবায় সাধারণ মানুষ এবং অপরাধীদের কেউ কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রাসী হওয়ার ফলে। দেশে আইন আছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন বাহিনী মাঠে থেকেও জনমনে স্বস্তি ফেরাতে কেনো সচেষ্ট হচ্ছে না?
সম্প্রতি মধ্যরাতে রামপুর বনশ্রী এলাকায় একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী তারই বাসার সামনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন। সঙ্গে থাকা ২০০ ভরি স্বর্ণ ও নগদ দেড় লক্ষ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা মিডিয়ায়। ফলশ্রুতিতে কী দাঁড়ালো? আমরা দেখতে পেলাম অপরাধী চক্রের দৌরাত্ম্যে একজন ব্যবসায়ী নিঃস্ব তো হলেনই উপরন্তু জীবন বিসর্জনের পথে! রাতে হাজারীবাগে ডাকাতির খবর পাওয়া গেছে। এই পরিস্থিতি যেনো গোটা দেশের চিত্র! কোনোটা আলোচনায় আসে, আর কোনোটা আসে না বলেই ধামাচাপা পড়ে যায়। মানুষ এখন ওপেন আকুতি জানিয়ে সেনাশাসন আহ্বান করছে! মানুষ মনে করছে সেনাবাহিনী পুরোদস্তুর মাঠে থাকলে হয়তো অপরাধী চক্রের বেআইনী দৌরাত্ম করতেও পারে! কিন্তু একটা বিষয় মানুষকেও বুঝতে হবে সেনাবাহিনী মেজিস্ট্রেসি পাওয়ার নিয়েই মাঠে আছে। কার্যত কী হচ্ছে? কতোটুকু হচ্ছে?
দেশের সাধারণ জনগণ আগে কখনো সেনাশাসন আহ্বান করেছে কি না? করলে এতো এতো করেছে কি না? আমার জানা নেই! তাহলে এখন কেনো সেনাবাহিনীর প্রতি মানুষের এতো এতো প্রবল আগ্রহ তৈরি হলো? আদতে মানুষ একটা বিষয়ই চাইছে, স্বস্তি! গত ৫ আগস্ট থেকে এই পর্যন্ত বিচারবর্হিভূত হত্যা, আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া প্রত্যক্ষ করেছে, যা দেখে মানুষ এতো বেশি মানসিকভাবে স্তম্ভিত হয়েছে। এর থেকে উত্তরণ ঘটানো হয়তো অনেক সময়সাপেক্ষ। আর জুলাই থেকে অভ্যুত্থান চলাকালীন ছাত্র-জনতা হত্যার ভিডিয়ো, স্থির চিত্র সব মিলিয়ে মানুষ কতোদিন পর স্বাভাবিক হবে, তা অনিশ্চিত!
এরই মধ্যে অনেকটা অপ্রত্যাশিত স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাংবাদিক সম্মেলন, যা রাত ৩টার পর অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি গতানুগতিক ধারায় তার ব্রিফিং করেছেন। আর তার পদত্যাগ চেয়ে মধ্যরাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিল করতেও দেখা গেছে। মিছিল থেকে তাকে সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে পরদিন দুপুর পর্যন্ত। যদিও এসংক্রান্তে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারলে তো আর পদত্যাগের দরকার পড়ছে না। সাধারণ নাগরিকরা কি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মহোদয়ের এমনতর আশ্বাসে আস্থা রাখতে পারছেন? যদি আস্থার সংকট থেকে থাকে তবে সমাধান কোনো পথে? যদিও অন্তর্বর্তী সরকার তথাপিও ধরে নেয়া হচ্ছে সেনাসমর্থিত। তাহলে সেনাবাহিনী প্রধান কি এসব দেখেও দেখছেন না? দেখে থাকলে এতোটা ভাবলেশহীন হয় কি করে, আমার বুঝে আসে না! তিনি গত ৫ আগস্ট মানুষের জানমালের হেফাজতে তার ওপর আস্থা রাখতে বলেছেন! তারপর থেকে আমরা যা দেখছি রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো অবস্থা। আমাদের এখনো বিশ্বাস করতে হচ্ছে দেশে আইন আছে। আইনের হেফাজতকারী আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে। তার মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট!
এই যখন দেশের অবস্থা। একটা টালমাটাল পরিস্থিতি উৎরিয়ে আমরা আর কতোদিনে স্বাভাবিক হবো? অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কিংবা জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং জামায়াত ও বিচ্ছিন্ন কিছু দল নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মতবিনিময় করে অবস্থান স্পষ্ট করলেও জট কিংবা নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। কারণ, সবাই যেখানে সংস্কার দাবিতে সোচ্চার সেখানে বিএনপি নির্বাচন দাবীতে চাপ সৃষ্টি করে আসছে। দলটির দাবি দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে নির্বাচিত সরকারের বিকল্প নেই। আর অন্যদিন জামায়াতও তাদের প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করতে শুরু করেছে। যদিও দলটি এতো তড়িঘড়ি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে নয়! তারা সংস্কার দাবি যতোটুকু করছে। আবার ক্ষণে ক্ষণে নির্বাচন দাবিও করে আসছে। দলটির একেক পর্যায়ের নেতৃত্ব থেকে একেক সময় একেক ধরনের দাবি চাউর হতে শুরু করায় সাধারণ জনগণ কিছুটা হলেও দ্বিধান্বিত! তার ওপর দলটি জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে বেশ শক্তপোক্ত অবস্থান নিয়ে মাঠে বিএনপির সঙ্গে বেশ ভালোই টক্কর দিতে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে নিশ্চুপ! তারা চাইছে সরকার যেভাবে নির্দেশনা দিবে ঠিক সেভাবেই করতে চায়।
এদেকে জাতীয় নাগরিক কমিটি কর্তৃক রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়টি আলোচনায় এলে বিএনপি তথাকথিত ‘কিংস পার্টি’ গঠনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সরকারে থেকে রাজনৈতিক দল গঠন জনগণ ভালোভাবে নেবে না। এই বার্তার মধ্যে দিয়ে মূলতঃ নিজেদের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। যেহেতু ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠন অনেকটাই নিশ্চিত, সেহেতু নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব যখন চরমে, ঠিক তখনই ঘোষণা আসতে পারে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে প্রভাবশালী সদস্য নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করে দলটির আহ্বায়ক হতে চলেছেন। আর সদস্যসচিব হিসেবে চার পাঁচ জনের নাম শোনা যাচ্ছে। দেখা যাক মানুষকে প্রত্যাশা বাণী শুনিয়ে কতোটা সফলকাম হতে পারেন নতুন রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব। সবকিছু সময়ের হাতেই তোলা থাকুক। এদিকে বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি যতোটা না রাজনীতি করে তার কমই বোঝে বলেও মনে করার কারণ অনুসন্ধান করা অতিশয় উক্তি হওয়ার কারণ নয়। যদিও তারা ধরে নিয়েছিল পটপরিবর্তন তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আদতে তেমন কোনো লক্ষণই পরিলক্ষিত হতে দেখা যাচ্ছে না। যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই দলটি বিচ্যুত হতে হতে মূল ট্র্যাক থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে বলেও বোদ্ধা মহলের ধারণা। দলটি মুখে যতো যা-ই বলুক কার্যত স্বস্তিতে নেই তার নেতারা। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশার মাত্রা অনুযায়ী চাপ সামলাতেও হিমশিম খেতে দেখা যাচ্ছে। কর্মীদেরকে যে আশা দেখিয়ে রাজনীতিতে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো নিজেদের অনুগত করে রাখার প্রচেষ্টা এই মুহূর্তে ঠিক কোনো কাজেই আসছে বলেও মনে হচ্ছে না। দলীয় হাইকমান্ড প্রতিনিয়ত বলে যাচ্ছে ‘শৃঙ্খলা’ নামক শব্দটি মেনে চলতে। কিন্তু এক্ষেত্রে কর্মীদের মনোভাব অনেকটাই ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি’ এর মতো। অভিযোগ পেলে শীর্ষ নেতার স্বাক্ষরিত আদেশে বহিষ্কারের খড়্গ কি তাদের দমিয়ে রাখতে পেরেছে? তাহলে তাদের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা কতোটা প্রতিফলন ঘটবে? সে প্রশ্নটিও তোলা রইলো ভবিষ্যতের খাতায়। ক্ষমতায় কে আসবে তা নয়, জনগণ স্বস্তি চায়। নিজ জীবনের নিরাপত্তা চায়।
গত ৫ আগস্ট থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে। যদি সেই পুরনো পথের পথিক হয়ে থাকে দলটির কর্মীরা তাহলে আর যা-ই হোক সহসাই ক্ষমতার পালাবদলের রায় তাদের পক্ষে যাওয়ার কোনো কারণও দেখছি না। এমনও দেখা গেছে জাস্ট ব্যক্তিগত কিংবা প্রফেশনাল জেলাসি থেকে মামলায় আসামী শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে বিজ্ঞ অ্যাডভোকেটদেরও। যেখানে একজন আইনজ্ঞ আইন পেশার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে থেকেও নিজেকে অনিরাপদ বোধ করার কারণ হয়েছেন সেই দলটি কিংবা তাদের মতো আর যে দলই আছে মানুষ তাদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়! অন্যদিকে সরকার সংশ্লিষ্ট সবাই বলছেন, ঢালাও মামলায় যেনতেন গ্রেফতার নয়। তারপরও আদালত কিংবা পেশাগত কোনো স্থানেও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়ে স্বয়ং আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিজেও ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে। মিডিয়ার বরাতে আমাদের তা-ও দেখতে হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তো বলেছেনই দায়িত্ব গ্রহণকালীন সময় থেকে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক উন্নত হয়েছে! বারবার উচ্চারণের ফলে একসময় মানুষও ভাবতে শুরু করবে হ্যাঁ আমরা ভালো আছি। বাকিটা নিয়তি!
পরিশেষে সাধারণ মানুষ ওইসব রাজনৈতিক জটাচাল কিংবা ঘোরপ্যাঁচ বুঝে না। বুঝতেও চায় না। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে সরকারের কাছে আর কীভাবে আর্জি জানালে নিরাপত্তা পাওয়া যায়? আমরা ক্রমেই গুম খুন ডাকাতি ছিনতাই রাহাজানি ও ধর্ষণের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না। আমরা চাই না সরকার ব্যর্থ হোক।
লেখক: অ্যাডভোকেট ও কলামিস্ট