জলবায়ুর পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের হুমকি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জরুরি ও জটিল সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই সমস্যাগুলো শুধু প্রকৃতিকেই নয়, মানবজাতির অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। জলবায়ুর পরিবর্তন মূলত গ্রিনহাউস গ্যাসের বৃদ্ধির কারণে ঘটছে, যা কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্যাসের অত্যধিক নিঃসরণের ফলাফল। শিল্পায়ন, যানবাহনের ব্যবহার, জীবাশ্ম জ্বালানির দহন এবং বন উজাড় করার মতো মানবসৃষ্ট কার্যক্রম এই গ্যাসগুলোর নিঃসরণকে ত্বরান্বিত করছে। এর ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে।
এমডিজির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) গ্রহণ করে। এসডিজির সময়সীমা ২০১৬ থেকে ২০৩০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। এমডিজির চেয়ে এসডিজি আরও ব্যাপক এবং সমন্বিত, যা শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নয়, বরং সমস্ত দেশের জন্য প্রযোজ্য। দারিদ্র্য বিমোচন,ক্ষুধামুক্তি ও টেকসই কৃষি, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, গুণগত শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, সাশ্রয়ী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো, অসমতা হ্রাস, টেকসই শহর ও সম্প্রদায়, দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন, জলবায়ু কর্ম, জলজ জীবন, স্থলজ জীবন, শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, লক্ষ্য অর্জনের জন্য অংশীদারিত্ব। তবে একটা জিনিস অনেকেই লক্ষ্য করবেন, এসডিজি বাস্তুতন্ত্রের শিরা উপশিরার মতো জড়ানো। যাদের ওপর শ্যোন দৃষ্টি জলবায়ুর পরিবর্তন।
বায়ু, জল ও মাটি দূষণের কারণে মানবস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্পকারখানা, যানবাহন, কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ। বায়ু দূষণের ফলে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের প্রকোপ বাড়ছে। জল দূষণের কারণে বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিচ্ছে, যা মানবস্বাস্থ্য এবং কৃষির জন্য হুমকিস্বরূপ। মাটি দূষণের ফলে কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে এবং খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া, প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে মিশে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। জীববৈচিত্র্যের হুমকি জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণের সরাসরি ফলাফল। পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী বাস করে, কিন্তু মানবসৃষ্ট কার্যক্রমের কারণে প্রতিদিনই অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বন উজাড়, অত্যধিক মাছ ধরা, কৃষিজমির সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়নের কারণে প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যকেই নষ্ট করছে না, বরং মানবজাতির খাদ্য নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং অর্থনীতিকেও বিপন্ন করছে। উদ্ভিদ ও প্রাণীরা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এবং তাদের বিলুপ্তি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এ বিষয়ে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো মাধ্যমে মানুষ এখনোও বুঝে ওঠেনি। পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন, সম্পদের সদ্ব্যবহার এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ এখনো আমাদের গোচরে হয়নি! জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের হুমকি শুধু কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা।
আমাদের দেশ একটি নিম্নাঞ্চলীয় দেশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি। এখানকার ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই সমস্যাগুলোকে আরও তীব্র করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা এবং লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বেড়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকাগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে এবং মিঠা পানির উৎস সংকট দেখা দিচ্ছে, যা কৃষি ও পানীয় জলের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ ছাড়া, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে।
জীববৈচিত্র্যের হুমকি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সুন্দরবন, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং মানবসৃষ্ট কার্যক্রমের কারণে সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া, দেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক বন ও জলাভূমি ধ্বংস হওয়ার ফলে অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশে বাঘ, হাতি, ডলফিন এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও মাছের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যকেই নষ্ট করছে না, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা এবং অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করছে। একটি টেকসই ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে এখনই এই সমস্যাগুলোর সমাধানে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি। জার্মানওয়াচের গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২১ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ এলাকা ২০৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর জিডিপির ১-২ শতাংশ ক্ষতি হয়।
গত চারদশকে ভোলা দ্বীপের প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার এলাকা সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ৬৭ সেমন্টমিটার বাড়লেই পুরো সুন্দরবনধ্বংস হয়ে যেতে পারে। অথচ এই সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক প্রহরী হিসেবে সন্তানের মতো আগলে রাখছে। প্রতিবছর নভেম্বর থেকে মে পর্য্ন্ত উপকূলীয় এলাকায় লবনাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যায়, যা বাস্তুতন্ত্রের দারুণভাবে হুমকির সৃষ্টি করছে। দেশের মোট ২৫ শতাংশ জমি উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। সাগরের পানির উচ্চতার কারণে লবনাক্তার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, পানীয় জলের অভাব, স্বাস্থ্য ঝুকিসহ জীবনযাত্রা দুর্বিসহ হয়ে উঠছে।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা গুলোর দিকে তাকালে আপনি অবশ্যই আাঁচ করতে পারবেন এ এলাকার মানুষ কতো জলবায়ুর পরিবর্তনের শিকার। চারিদিকে পানি কিন্তু খাবার পানি নেই! অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে গাছপালা শূন্য এ এলাকার মানুষগুলো পুড়ে কালো হয়ে গেছে। মনে হয় কয়লার খনি থেকে এইমাত্র কাজ করে ফিরলো! বৃষ্টিপাতের অসম ক্যালেন্ডারের কারণে এই সময়ে যদি বৃষ্টিপাত শুরু হয় তাহলে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো পরিবেশ, যাদের হাতে পরিবেশ আজ ধ্বংসের মুখে তাদের দিকে তেড়ে আসে পচা, বাসী গন্ধ ছড়ায়!
দেশের বন বিভাগের মোট জমির পরিমান ৩৭ লক্ষ ৭১ হাজার ১২৪ একর। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের থেকে এ পর্য্ন্ত দেশে বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা কমেছে প্রায় ৪ লক্ষ ৯৪ হাজার ২১১ একর। আমরা গাছ কেটে প্রকল্প করছি ঠিক আছে কিন্তু প্রকল্প করে গাছ লাগাচ্ছি না! অধীক জনসংখ্যার এই দেশে জনসংখ্যাকে সঠিক ব্যবহার না করলে নিজের শেষকৃত্য করার জায়গাটুকু ও থাকবে না!
সুন্দরবন, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট কার্যক্রমের কারণে হুমকির মুখে। সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা মাত্র ১০০-১৫০টি, বাংলাদেশে ১৬০টি প্রাণী প্রজাতি এবং ১২০টি উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। হালদা নদী বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। সেটাও দূষণ ও বাঁধ নির্মাণের কারণে হুমকির মুখে।
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তসরকারি প্যানেল এর ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১.১ সে. বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি এই হার অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০৩০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ১.৫ সে. অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বিশ্বের ৮০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রধান উৎস হলো জীবাশ্ম জ্বালানি, যা বিশ্বের শতকরা ৭৫ ভাগ কার্বন নিঃসরণের জন্য দায়ী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে, প্রতিবছর ৭০ লাখ মানুষ বায়ু দূষণের কারণে অকালে মারা যায়। প্লাস্টিক দূষণ একটি বৈশ্বিক সংকট। প্রতি বছর ৮ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সমুদ্রে প্রবেশ করে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের হুমকি মোকাবিলায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে-
নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার: জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং জলবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে বায়ু দূষণ কমানো সম্ভব। বন সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণ: বনভূমি সংরক্ষণ এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা যায়।
সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বর্জ্য নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভূমি ও পানি দূষণ কমানো সম্ভব।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবেশ সংরক্ষণে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব আচরণ উৎসাহিত করা উচিত।
নীতিগত পদক্ষেপ: সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
সার্বিকভাবে, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের হুমকি মোকাবিলায় ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে দেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব।
লেখক: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত